মোঃ রফিকুল ইসলাম সোহাগ
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে ইতালিতে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচার এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এক নারীসহ তার ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—জগন্নাথপুর উপজেলার ইছাকপুর গ্রামের মোছা. শোবি বেগম (৩০) ও তার ভাই শামছুল (২৮)। তারা দীর্ঘদিন ধরে পলাতক ছিলেন বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জগন্নাথপুর থানা-পুলিশ জানতে পারে, মামলার আসামিরা সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ থানা এলাকায় অবস্থান করছেন। পরে জগন্নাথপুর থানার এসআই মতিউর রহমান, এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, এসআই অনিক পাল ও এএসআই আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শাহপরাণ থানা-পুলিশের সহায়তায় সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।
ইতালি পাঠানোর নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজনের যোগসাজশে একটি মানবপাচার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়ে আসছিল। ইতালিতে ভালো চাকরি দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় বেকার যুবকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভুক্তভোগীদের প্রথমে লিবিয়ায় পাঠানো হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হতো। কয়েকজন ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনের দাবি, লিবিয়ায় আটকে রেখে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই এ প্রতিবেদনের সময় সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের অভিযোগ
কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের সইফুল মিয়া অভিযোগ করেন, সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে মোট ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে আরও টাকা দাবি করা হয় এবং নির্যাতন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
একই গ্রামের আবু তাহের মিয়ার অভিযোগ, তার ছেলে বিন আমিনকে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে পরিবারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে তার অভিযোগ।
সাদীপুর গ্রামের জহুর আলীর ছেলে সেলিমের অভিযোগ, ইতালি পাঠানোর কথা বলে তার কাছ থেকে মোট ৪৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এছাড়া এলাক মিয়ার মেয়ের জামাই এমরান হোসেন আদিলও একইভাবে প্রতারণা ও লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে থাকা অভিযুক্তদের সঙ্গে ইতালি ও লিবিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজনের যোগাযোগ ছিল। তারা বিদেশে ভুক্তভোগীদের যাতায়াত ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, শুধু স্থানীয় পর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেই এ চক্রের পুরো নেটওয়ার্কের তথ্য বের হবে না। বিদেশে অবস্থানরত কথিত সহযোগীদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি
গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। একই সঙ্গে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের আরও দাবি, লিবিয়ায় এখনো কোনো বাংলাদেশি নাগরিক আটকে থাকলে তাদের শনাক্ত করে উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিক। পাশাপাশি প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া অর্থ উদ্ধারেরও দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
পুলিশের বক্তব্য
জগন্নাথপুর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই নূর হোসেন জানান, গ্রেপ্তার দুজনের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক লিখিত অভিযোগ ও মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, মামলার তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আদালতের কাছে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত কথিত সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।